![]() |
| Add caption |
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ওপর যত জানছি ততই বিস্মিত হচ্ছি। মানুষ এত ভার্সেটাইল হয় কিভাবে? জনাব রুহুল আমিন কর্তৃক সংকলিত “জিয়াউর রহমান স্মারক গ্রন্থ” তে দেখলাম জনাব তারেক রহমান তার বাবা কে নিয়ে স্মৃতিচারন মুলক “আমার বাবা” নামে একটা আত্ম স্মৃতি লিখছে। সেখানে ৮ টি ঘটনা আছে, যেখান থেকে ব্যাক্তি জিয়া কেমন ছিলেন তার একটা ধারনা পাওয়া যায়। সেই ৮ টি ঘটনা ধারাবাহিক ভাবে অন লাইনের বিশাল সংখ্যক জিয়ার আদর্শে বিশ্বাসীদের সাথে একজন পিতা হিসাবে জিয়াউর রহমান কেমন ছিলেন জানানোর জন্য তার জবানীতে এই লেখা
একঃ ১৯৭৬ সালের ঘটনা। তখন স্কুলে পড়ি। প্রতিদিনের মত সেদিন ও আমরা দু’ ভাই সকাল ৭টায় বের হচ্ছি স্কুলে যাবার উদ্দেশ্যে। বাবা অফিসে যাবার জন্য তার গাড়ীতে উঠছে। হঠাৎ তার গাড়ীর ব্রেক লাইট জ্বলে উঠল, আমাদের গাড়ীর ড্রাইভার কে গেট থেকে জোরে ডাক দিলেন। আমরা গাড়িতে বসা। ড্রাইভার গাড়ী থেকে নেমে বাবার কাছে গেল, যখন ফিরে এল মনে হল বাঘের খাচা থেকে ফিরে এসেছে। জিজ্ঞেস করলাম কি ব্যাপার? উত্তরে বলল, “স্যার এই বেলা আপনাদের নামিয়ে দিয়ে অফিসের পি এসের কাছে রিপোর্ট দিতে। এখন থেকে ছোট গাড়ী নিয়ে স্কুলে যাতায়াত করতে হবে। ছোট গাড়ীতে তেল খরচ কম হয়। আর এই গাড়ীর চাকা খুলে রাখতে বলছে।” উল্লেখ্য আমাদের যে গাড়ীটি নিয়ে স্কুলে আসা যাওয়া করত সেটি সরকারী বড় গাড়ী।
দুইঃ তখন আমার বয়স কম। স্কুলে পড়ি। কিছু গালাগালি রপ্ত করছি। সময় পেলেই আক্রমনের সুযোগ হাতছাড়া করিনা। বাসার সামনের রাস্তায় পাড়ার বন্ধুদের সাথে সন্ধ্যার পর আড্ডা মারছিলাম। রাস্তা দিয়ে মাঝে মধ্যেই গাড়ী আসা যাওয়া করছে। গেটে কর্তব্যরত গার্ড দাড়িয়ে ডিউটি করছে দাড়িয়ে। আমাকে বলল “ভাইয়া সন্ধ্যা হয়ে গেছে। ভেতরে যান।” আর যায় কোথায়? আড্ডার মাঝে বিড়ম্বনা? যা মুখে আসে স্বরচিত কবিতার মত বলে গেলাম। আড্ডা শেষে ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফিরলাম। কোন মতে পড়া শেষ করে খাওয়া দাওয়া করে ঘুমিয়ে পড়লাম।
বোধহয় ঘন্টা দুয়েক ঘুমিয়ে ছিলাম। হঠাৎ মনে হল ভুমিকম্প হচ্ছে। চোখ খুলে দেখি শিকারের সময় বাঘ যেভাবে হরিন শাবক ধরে, বাবা ঠিক সেভাবে আমার মাথার চুল টেনে উঠিয়ে বসাচ্ছে আর বাঘের মত গর্জন করে বলছেন, “কেন গাল দিয়েছিস? ও কি তোর বাপের চাকুরি করে? যা মাফ চেয়ে আয়।” আম্মাকে বললেন, “যাও ওকে নিয়ে যাও, ও মাফ চাবে তারপর ঘরে ডুকবে।”
মা আমাকে নিয়ে গেলেন সামনের বারান্দায়। বিনা কারনে গালি খাওয়া ব্যাক্তিটিকে ডেকে আনা হল। যদিও গার্ডটি অত্যন্ত বিনয়ের সাথে আম্মাকে বলল, “না ম্যাডাম ভাইয়ার ক থায় আমি কিছুই মনে করিনি। ছোট মানুষ অমন করেই।” জানি না সেই গার্ড ভদ্রলোকটি কোথায় আছেন? তবে ২৬ বছর পর আজ যদি উন বেচে থাকেন এবং এই লেখা পড়েন তবে বলছি “সেদিন আমি না বুজে যা বলেছি, তার জন্য আমি আপনার কাছে ক্ষমা প্রার্থী।”
তিনঃ তখন বাবা প্রেসিডেন্ট। হঠাৎ বিটিভি থেকে খবর এল গান গাইতে হবে। বয়স কম। গানের “গ” ও পারি না তাও আবার টিভিতে। আমাকে পায় কে? প্রযোজক বললেন, “কোন অসুবিধা নেই আমি ঠিক প্রেসিডেন্ট র ছেলেকে দিয়ে গান গাইয়ে নেব এবং সুন্দর গান হবে।” গান গাইলাম। বুজতেই পারছেন সবাই কি গান গেয়েছিলাম। পরে যখন নিজে সে গান শুনলাম মনে হল রেকর্ডিং এর সে সময় কেন কারেন্ট চলে গেল না? অবশ্য রাতে স্বপ্ন দেখলাম আমি বিরাট গায়ক হয়ে গেছি। হাজার শ্রোতা আমার গান মুগ্ধ হয়ে শুনছে। কয়দিন পর প্রযোজক কে আবার ফোন দিলাম “চাচা আবার কবে গান গাইব?” প্রযোজক সাহেব বললেন, “বাবা প্রেসিডেন্ট এর পি এস সাহেব ফোন করে তোমাকে টিভির অনুষ্ঠান দিতে বারন করছে।” ব্যাস সেই মুহুর্ত থেকে আমার গায়ক হবার খায়েশ মিটে গেছে।
চারঃ বাবার প্যান্ট শার্ট ছোট হয়ে গেলে বা পুরান হয়ে গেলে বঙ্গভবনের দর্জিকে দিয়ে ওগুলো ছোট করে আমাদের দুই ভাইর জন্য নতুন জামা প্যান্ট তৈরী হত। আমরা বাসায় সচারচর ওগুলো পরতাম। বাইরে যাবার জন্য দুই ভাইর এক জোড়া ভালো জামা প্যান্ট ছিল। বন্ধুদের দেখতাম কত ভালো ভালো জামা কাপড় পড়ে। এগুলো নিয়ে অনুযোগ করলে বাবা বলতেন, “তোমাদের বাবা বড়লোক নয়, সামান্য কয়টা টাকার বেতনে চাকুরী করে। তার সামর্থ্যে যা আছে তোমাদের তাই পড়তে হবে।” পরে অবশ্য বাবার পুরানো জামা প্যান্ট পড়া আমাদের অভ্যাস হয়ে যায় তাই এ নিয়ে আর অনুযোগ করিনি।
পাচঃ আব্বু খুব সকালে ঘুম দিয়ে উঠতেন। প্রায় ই তাহাজ্জুদের নামায পড়তেন। আমাদের সরকারী বাড়ীর আঙ্গিনায় তিনি এরপর জগিং করতেন। ফযরের নামাযের আযান শুনলেই তিনি নামায পড়ার প্রস্ততি নিতেন। মাঝে মাঝে ব্যায়াম শেষ করে বাসার বাইরে ব্যারাকে অবস্থানরত সৈনিক দের ঘুম ভাঙ্গাতেন এবং তাদের কে নিয়ে একসাথে নামায পড়তেন। অনেক সময় হাবিলদার মুজিব আর হাবিলদার লুৎফর বেশী রাত করে ডিউটি করার কারনে ঘুম থেকে উঠতে দেরী করত।
আব্বা ঠুক ঠুক করে তাদের দরজায় আওয়াজ করতেন আর নাম ধরে ডাকতেন। কখনো কখনো তাদের ঘুম ভাঙ্গতে ৫/১০ মিনিট দেরী হত, তিনি কিছুই মনে করতেন না কখনো কখনো তাদের কাছে ঘুম ভাঙ্গানোর জন্য অনুতপ্ত হতেন পরক্ষনেই বলতেনা, “আমি এভাবে ঘুম না ভাঙ্গালে তোমরা ঘুমিয়ে থাকতে আর ফযরের নামায পড়তে পারতে না। প্রত্যেক মুসলমানের ৫ ওয়াক্ত নামায পড়া ফরয। তোমরা আমার বাসায় ডিউটিরত। সুতারাং তোমরা আমার পরিবারের সদস্যর মত আমার ছোট ভাইয়ের মত। অভিবাবক হিসাবে বড় ভাই হিসাবে তোমরা যাতে নামায পড় সেটা দেখা শুনা করা আমার দায়িত্ব। না হলে এর জন্য মহান রাব্বুল আলামীনের কাছে এর জন্য আমাকে জবাবদিহী করতে হবে।” আমরা ছোট ছিলাম বিধায় তখন আব্বুর হাত থেকে রক্ষা পেয়েছি।
ছয়ঃ ১৯৮০ সালের ঘটনা। আব্বু শহীদ হবার এক বছর আগে। একদিন সন্ধ্যাবেলা দুই ভাই সলা পরামর্শ করে বড় ভাই হিসাবে আমি আম্মুর সামনে গিয়ে দাড়ালাম। বললাম “আম্মু আমিও তোমাদের সাথে যাব” আম্মু বললেন “কোথায়?” আমি বললাম, “কেন নেপালে?” কারন তার কয়েক দিন আগে নেপালের রাজা বীরেন্দ্র বিক্রম শাহ দেব, রানী ঐশ্বর্য্যময়ী তাদের দু ছেলেকে বাংলাদেশে আসে।
ফিরতি সফরে আব্বু আম্মুকে নিয়ে রাষ্ট্রীয় সফরে নেপালে যাচ্ছিল। তাই আমরাও ভাবলাম রাজার ছেলে যদি আসতে পারে তবে আমরাও যেতে পারি। সমস্যা কোথায়? আম্মু আমার কথা শুনে মুচকি হাসলেন।
এদিকে কখন যেন আব্বু পেছনে এসে দাড়িয়েছে খেয়াল করিনি। হঠাৎ পেছন থেকে ভারী গলার আওয়াজ আসল কিন্তু তাতে ছিল স্নেহের পরশ। “তা ঠিক রাজার ছেলেরা এসেছিল বাংলাদেশে কারন তারা ছিল রাজার ছেলে। কিন্তু বাবারা তোমরা তো রাজার ছেলে নও। তোমরা যেতে পারবে না। আমি যাচ্ছি রাষ্ট্রীয় সফরে। তোমরা যদি যাও তবে রাষ্ট্রীয় টাকা অপচয় হবে। মানুষ মন্দ বলবে। তুমি কি তাই চাও?”
সাতঃ তখন সম্ভবতঃ ১৯৭৯ সালের নভেম্ভর মাস। উত্তর কোরীয় শিশু শিল্পীরা শিল্পকলা একাডেমীতে তিন দিন ব্যাপী নৃত্য সঙ্গীত সার্কাস দেখাচ্ছিল। আমাদের অনেক বন্ধুরাই সে অনুষ্ঠানে যাবে বলে ঠিক করেছে। আমরা দু ভাই অনুষ্ঠানে যাব বলে আম্মাকে বলি। আম্মা বঙ্গবভনে ফোন করে বলে, সেখান থেকে শিল্পকলা একাডেমীতে বলে দেয়া হয় আমাদের জন্য বিশেষ ব্যাবস্থা করতে। এরই মাঝে বাবার কানে কথাটা গেল।
তিনি বললেন, “ওদের যদি অনুষ্ঠান দেখতেই হয় তবে যেন প্রেসিডেন্ট এর পরিচয় না দিয়ে সাধারন মানুষ যেভাবে অনুষ্ঠান দেখে তবে সেভাবে দেখতে হবে।” যথা আদেশ তথা কাজ। একটি সাধারন গাড়ী করে ব ঙ্গভবনের একজন ষ্টাফ আমাদের শিল্প কলা একাডেমীতে নিয়ে গেল। যেহেতু আগে সব সিট বুক হয়ে গিয়েছিল তাই উনি আমাদের শেষের দিকের সিটে বসিয়ে দিলেন। গরমে সেদ্ধ হলেও আমরা অনুষ্ঠান উপভোগ করলাম।
আটঃ বাবা তখন প্রেসিডেন্ট হয়েছে। তারপর আমরা আত্মীয় স্বজনের কাছ থেকে অনেক টা দূরে সরে ছিলাম। তারাও খুব একটা আসত না। আম্মুকে এর কারন জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, “তোমার বাবা এখন দেশের প্রেসিডেন্ট। তিনি চান না তার কোন নিকট আত্মীয় বাসায় আসুক। নিকট আত্মীয় স্বজন কিছু বললে ফেলা যায় না কিন্তু তিনি চান না তিনি প্রেসিডেন্ট হিসাবে তার কোন আত্মীয় যেন কোন সুযোগ না নিতে পারে আর দশজন যে সুবিধা ভোগ করত তারাও সেটা পাক। সুতারাং তোমাদের কষ্ট করে হলেও এই আদেশ মেনে নিতে হবে। কি আর করা কিশোর মনে সেটা ভালো না লাগলেও সেটা মেনে নিতে হত।
BNCUP News And Publicity Desk
BNCUP News And Publicity Desk
Posted By: Admin

No comments:
Post a Comment
Thank's for your comment....